রচনানির্মিতিবাংলা

রচনাঃ সংবাদপত্র

সংবাদপত্র/ আধুনিক জীবন ও সংবাদপত্র

আজকের পোস্টে আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রচনা শেয়ার করব “ সংবাদপত্র/ আধুনিক জীবন ও সংবাদপত্র বাংলা রচনা“। এই রচনাটি আশা করি তোমাদের পরীক্ষায় কমন আসবে। আমরা এই রচনাটি যত সম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করেছি – তোমাদের পড়তে সুবিধা হবে। চলো শুরু করা যাক।

সংবাদপত্র/ আধুনিক জীবন ও সংবাদপত্র

জ্ঞান বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা

 আধুনিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ বাহন ‘সংবাদপত্র’। নানা প্রকার সংবাদ বহন করে থাকে বলে একে ‘সংবাদপত্র’ নামে অভিহিত করা হয়। সভ্যতার ক্রমবিবর্তনে অসংখ্য কল্যাণকর সৃষ্টিতে মানবজীবন প্রতিনিয়তই সমৃদ্ধ হচ্ছে। সংবাদপত্র মানুষের কর্মমুখর জীবনের গতিকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করেছে। যুগের চাহিদায় একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে প্রয়োজন বিশ্বের ঘটনাস্রোতের সাথে তাল রেখে সম-পদক্ষেপে পথ চলা। সংবাদপত্র সেই পথটিকে সুপ্রশস্ত করেছে। আজকের সভ্য সমাজে সংবাদপত্রহীন জীবনের কথা কেউ কল্পনাও করতে পারে না ৷

সংবাদপত্রের প্রচলন

সংবাদপত্র প্রচলনের কথা কে প্রথম চিন্তা করেছিলেন সে তথ্য সম্পর্কে আজ নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তবে জানা যায়, একাদশ শতাব্দীতে চীন দেশে সর্বপ্রথম সংবাদপত্রের প্রচলন হয়। মুঘল শাসনামলে আমাদের দেশে বাদশাহি ফরমান, বিজ্ঞপ্তি ইত্যাদি হাতে লিখে প্রজাদের মধ্যে প্রচার করা হতো। ইউরো প্রথম সংবাদপত্র প্রচলিত হয় ভেনিস শহরে। রানি এলিজাবেথের সময় ইংল্যান্ডে ‘গেজেট’ নামক একটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় । আমাদের দেশে ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় ‘বেঙ্গল গেজেট’। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন উইলিয়াম হিকি। সম্পাদকের নামানুসারে এটি ‘হিকির গেজেট’ নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। বাংলা ভাষার প্রথম সংবাদপত্র ‘সমাচার দর্পণ’। জে. সি. মার্শম্যানের সম্পাদনায় পশ্চিমবঙ্গের শ্রীরামপুর মিশন থেকে ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে ‘সমাচার দর্পণ’ প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রথমে এটি সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হলেও পরে তা দৈনিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীতে রাজা রামমোহন রায় ‘সংবাদ কৌমুদী’ এবং ঈশ্চরচন্দ্র গুপ্ত ‘সংবাদ প্রভাকর’ নামে দুটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। সময়ের রহমান স্রোতধারায় বিশ্বের প্রতিটি দেশ থেকেই আজ প্রকাশিত হচ্ছে অসংখ্য সংবাদপত্র ।

See also  প্রতিবেদনঃ পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য চাই বৃক্ষরোপণ' -এ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন রচনা কর

সংবাদপত্রের বিকাশ

বর্তমান বিশ্বে সংবাদপত্রের অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে। টেলিপ্রিন্টার, টেলিফোন, মাইক্রোওয়েভ, ইলেকট্রিক টেলিপ্রিন্টার, বেতার, ফ্যাক্স প্রভৃতির মাধ্যমে স্বল্প সময়ে সংবাদ সংগ্রহ করে তা আবার সংবাদপত্রের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। মুদ্রণ ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্রের প্রকাশ ও প্রচার বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে ।

সংবাদপত্রের প্রকারভেদ

সংবাদপত্র নানা ধরনের হয়ে থাকে। যেমন— দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক, বার্ষিক ইত্যাদি। তবে সংবাদপত্র বলতে আমরা সাধারণত দৈনিক পত্রিকাকেই বুঝে থাকি

আরো পড়োঃ

বাংলাদেশের সংবাদপত্র

বাংলাদেশে দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক প্রভৃতি পত্রিকা রয়েছে। দৈনিক পত্রিকাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— ‘ইত্তেফাক’, ‘সংবাদ’, ‘ইনকিলাব’, ‘জনকণ্ঠ’, ‘ভোরের কাগজ’, নয়া দিগন্ত, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ‘আজকের কাগজ’, ‘দিনকাল’, ‘সংগ্রাম’, ‘মিল্লাত’, ‘জনতা’, ‘আল মোজাদ্দেদ’, ‘মুক্তকণ্ঠ’, ‘প্রথম আলো’ আমাদের সময়, আলোকিত বাংলাদেশ ইত্যাদি। দৈনিক ইংরেজি পত্রিকাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘অবজারভার’, ‘টাইম্স’, ‘মর্নিং নিউজ’ ইত্যাদি। ‘বেগম’, ‘রোববার’, ‘বিচিত্রা’, ‘পূর্ণিমা’ ইত্যাদি সাপ্তাহিক পত্রিকা। এছাড়াও রয়েছে অসংখ্য পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক পত্রিকা। দৈনিক পত্রিকাগুলো সাধারণত দৈনিক সংবাদ পরিবেশন করে থাকে। সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, ব্যবসায়-বাণিজ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রভৃতি বিষয়গুলোও দৈনিক সংবাদপত্রসমূহে পরিবেশন করা হয়। সাপ্তাহিক, পাক্ষিক প্রভৃতি পত্রিকায় গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ প্রভৃতি বিষয়গুলো সর্বাধিক গুরুত্ব লাভ করে থাকে ।

সংবাদ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান

দেশ-বিদেশের বিচিত্র সংবাদ সন্নিবেশিত করে যাতে স্বল্প সময়ে সংবাদ পরিবেশন করা যায় তজ্জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সংবাদ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে। এদের মধ্যে রয়টার, ইউনাইটেট প্রেস, এনা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এ সংস্থাগুলো তাদের শাখাসমূহের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে পুনরায় তা পত্রিকা- প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরবরাহ করে থাকে। বাংলাদেশের সংবাদ সংস্থার নাম ‘বাসস’।

সংবাদ সংগ্রহ

পত্রিকা প্রতিষ্ঠানসমূহ বিভিন্ন সংবাদ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে থাকে। এছাড়াও প্রতিটি পত্রিকারই রয়েছে নিজস্ব সংবাদদাতা। তারা বিভিন্ন দেশ থেকে অথবা দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে প্রেরণ করে থাকেন। এভাবে একটি পত্রিকা প্রতিষ্ঠান সংবাদ সংগ্রহের মাধ্যমে তা দ্রুত পত্রিকায় ছেপে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়।

See also  ভাবসম্প্রসারণঃ বিদ্যার সঙ্গে সম্পর্কহীন জীবন অন্ধ এবং জীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন বিদ্যা পঙ্গু

সংবাদপত্রের উপকারিতা

আধুনিক সভ্য সমাজে সংবাদপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। সংবাদপত্রের মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর বহু বিচিত্র ঘটনাবলি স্বল্প সময়ে ঘরে বসে জানতে পারি। কোনো মানুষই আজ আর দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ নয়। সংবাদপত্রের মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র প্রভৃতির মধ্যে এক ঘনিষ্ঠ নৈকট্যের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ যতই তার প্রাত্যহিক পরিবেশ থেকে বাইরের জগৎ ও জীবন সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে তার কাছে সংবাদপত্রের গুরুত্ব ততই বেড়ে যাচ্ছে। একজন সংবাদপত্র পাঠক পত্রিকার মাধ্যমে দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে অবগত হয়ে তার চিন্তা ও কর্মশক্তিকে উৎকৃষ্ট পন্থায় চালিত করতে প্রয়াস পাচ্ছে। তাই সংবাদপত্র ছাড়া শিক্ষিত মানুষের আজ এক মুহূর্তও চলে না। চলতি ঘটনাপ্রবাহ থেকে শুরু করে জ্ঞান-বিজ্ঞান, লোকশিক্ষার প্রসারে সংবাদপত্রের ভূমিকা অতুলনীয়। রাষ্ট্র পরিচালনা, জনমত সৃষ্টি, সামাজিক বিকাশ ও সমৃদ্ধি অর্জনে সংবাদপত্রের প্রচার একটি কার্যকরী উত্তম পদ্ধতি বলে স্বীকৃত।

সংবাদপত্রের গুরুত্ব বিবেচনা করে হেনরী ওয়ার্ড থেচার বলেছেন, ‘জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখের প্রতিফলন ঘটে একমাত্র সংবাদপত্রেই।’ প্রখ্যাত নাট্যকার আর্থার মিলার সংবাদপত্রের সৌকর্য এবং ব্যবসায়িক দিক সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, বর্তমানে সংবাদপত্র একটি বৃহৎ শিল্প এবং লাভজনক ব্যবসায় ।’

সংবাদপত্রের ক্ষতিকর প্রভাব

সংবাদপত্রে একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম ও সাফল্যের প্রতিফলন ঘটলেও একথা সত্য যে, অবিমিশ্র উপকার কোনোকিছু থেকে সর্বাংশে পাওয়া যায় না। সংবাদপত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। অনেক সময় সংবাদপত্র মিথ্যা-বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশন করে থাকে। কিন্তু একটি জাতির দৈনন্দিন মানস-দর্পণে এ ধরনের কলঙ্ক থাকা উচিত নয়। সংবাদপত্রের মিথ্যা প্রচার অনেক সময় বিরাট অনর্থ ঘটাতে পারে। অথবা কোনো কোনো সংবাদের প্রচারে জাতিতে জাতিতে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠতে পারে। তাই সংবাদপত্রকে যেমন বাস্তবনিষ্ঠ হতে হবে তেমনি যারা এটি পরিচালনা করে থাকেন তাদেরকেও হতে হবে বুদ্ধিমান, দায়িত্বশীল এবং বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন। একটি দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি ঐতিহ্য-রুচি-বিশ্বাস প্রভৃতিকে সংবাদপত্র যত সহজে ধ্বংস করে দিতে পারে অন্য কোনো মাধ্যম তা পারে না। তাই সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা সম্পর্কে পাঠককেও পাশাপাশি সচেতন থাকা প্রয়োজন— কেননা কোনো উদ্দেশ্য প্রণোদিত মিথ্যা সংবাদ যেন কাউকেই সহজে বিভ্রান্ত করতে না পারে ।

See also  আবেদন পত্রঃ বন্যার্তদের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী চেয়ে সচিবের নিকট আবেদন পত্র লেখ

উপসংহার

সংবাদপত্র দেশ ও সমাজের মুখপত্র। কোনো জাতির জাগরণ, দায়িত্ব ও কর্তব্য সচেতনে সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম। সমাজ ও জাতির কল্যাণে সংবাদ পরিবেশনে যেকোনো পত্রিকা পরিচালককে হতে হবে দল নিরপেক্ষ এবং দূরদর্শী। সর্বোপরি জাতির অগ্রগতি, উন্নয়ন ও কল্যাণে সংবাদ পরিবেশনের স্বচ্ছতার পাশাপাশি প্রয়োজন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ।

আশা করি আজকের পোস্টটি তোমাদের ভালো লেগেছে। তুমি যদি অন্য কোনো রচনা চাও তাহলে আমাদের কমেন্টের মাধ্যমে জানাও। ধন্যবাদ।

Related posts

রচনাঃ শ্রমের মর্যাদা

Swopnil

রচনাঃ আর্সেনিক দূষণ

Swopnil

অনুচ্ছেদঃ ইন্টারনেট

Swopnil

Leave a Comment