নির্মিতিরচনা

রচনাঃ ট্রেন ভ্রমণ

ট্রেন ভ্রমণ / ট্রেনে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা / একটি ভ্রমণ কাহিনি

আজকের পোস্টে আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রচনা শেয়ার করব “ট্রেন ভ্রমণ / ট্রেনে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা / একটি ভ্রমণ কাহিনি বাংলা রচনা“। এই রচনাটি আশা করি তোমাদের পরীক্ষায় কমন আসবে। আমরা এই রচনাটি যত সম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করেছি – তোমাদের পড়তে সুবিধা হবে। চলো শুরু করা যাক।

ট্রেন ভ্রমণ / ট্রেনে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা / একটি ভ্রমণ কাহিনি

ভূমিকা 

ভ্রমণের সঙ্গে আনন্দের যেমন সংযোগ আছে তেমনি আছে জ্ঞানের সংস্রব। ভ্রমণে মানুষের মন যেমন প্রফুল্ল হয় তেমনি অনেক অজানার সন্ধান লাভ করা যায়। বিশাল পৃথিবীর কত না রূপ ঐশ্বর্য-কত জনপদ, কত মরু-পর্বত, সমাজ-সভ্যতা-সংস্কৃতির কত বিচিত্র অবয়ব। তার কতটুকুই বা দেখার সৌভাগ্য হয় গৃহবাসী মানুষের। 

সৌন্দর্য পিপাসু মানুষের সীমাবদ্ধতার হাহাকার তাই ধ্বনিত হয় কবির কণ্ঠে :

‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি ।

দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী- মানুষের কত কীর্তি, কত না নদী গিরি সিন্ধু-মরু কত না অজানা জীব, কত না অপরিচিত তরু রয়ে গেল অগোচরে।’

ভ্রমণ শিক্ষার অঙ্গ 

মানুষ অজানাকে জানতে চায়, বিচিত্রকে উপভোগ করতে চায়। পথ-প্রান্তরের, নগর-জনপদের সৌন্দর্য- সিন্ধুতে অবগাহন করার জন্য মানুষ পাড়ি দেয় দেশ-দেশান্তর। ভ্রমণ কেবল আনন্দ লাভ নয়, ভ্রমণ শিক্ষারও অঙ্গ। ভূগোল বইয়ের পাতায় আঁকা মানচিত্র ভ্রমণে হয়ে ওঠে বাস্তব ও প্রত্যক্ষ। ভ্রমণের মাধ্যমে যে অভিজ্ঞতা ঘটে তা শিক্ষাকে পরিপূর্ণ ও অর্থময় করে তোলে । ভ্রমণে আনন্দ ও অভিজ্ঞতার সঞ্চয় একটা বড় প্রাপ্তি । 

ভ্রমণের পথসমূহ 

স্থলপথ, জলপথ, আকাশ পথ-এ তিন পথেই সাধারণত ভ্রমণ করা যায়। স্থলপথে সাইকেল ভ্রমণ, মোটর সাইকেল ভ্রমণ, বাস ভ্রমণ, টেক্সি ভ্রমণ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। জলপথে নৌকাভ্রমণ, লঞ্চ ভ্রমণ, ইস্টিমার ভ্রমণ উল্লেখযোগ্য। স্থলপথে দীর্ঘ পথযাত্রায় ট্রেনে ভ্রমণ আরামপ্রদ ও বিচিত্র অভিজ্ঞতা রঞ্জিত। ট্রেনে ভ্রমণের একটি স্মৃতি আমার জীবনে অক্ষয় হয়ে আছে। কবি শামসুর রাহমানের সেই ছড়াটি পড়ার পর আমার মধ্যে ট্রেন ভ্রমণের একটা অদম্য আগ্রহ সৃষ্টি হয় :

ঋক্ ঝকাঝক ট্রেন চলেছে রাত দুপুরে অই ।

ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে ট্রেনের বাড়ি কই?’

বইয়ের পাতায় মুদ্রিত ধুঁয়া ওড়িয়ে ট্রেন চলার দৃশ্যে চোখ রেখে কল্পনার কান পাতলেই যেন শুনতে পেতাম ট্রেনের হুইসেল । ঝিক্ ঝিক্ শব্দ তুলে দূরের পানে চলে যাচ্ছে ট্রেন। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে একদিন সেই ট্রেন ভ্রমণের সুযোগ এসে গেল। বাবা একদিন অফিস থেকে বাসায় ফিরে জানালেন ‘চলো সিলেট থেকে ঘুরে আসি।’ বাবার এ ঘোষণায় ভাইয়া ও আমি মহাখুশি। দিনক্ষণের আর তর সইছিল না।

যাত্রার প্রস্তুতি 

এক সময় প্রতীক্ষিত দিনটি এসে গেল। বাবা অগ্রিম টিকেট করে এনেছেন। যাত্রার আগের দিন আমরা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও কাপড়-চোপড় গুছিয়ে নিলাম। ২৪ ডিসেম্বর সকাল ৬:৪০ মিনিটে ঢাকার কমলাপুর স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়বে। সকাল সোয়া ছয়টার মধ্যে মা, বাবা, ভাইয়া ও আমি কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। ২নং প্লাটফর্মে সিলেটগামী ‘পরাবত’ অপেক্ষা করছিল। স্টেশনে যাত্রীদের ছুটাছুটি ব্যস্ততার কমতি নেই। কেউ প্লাটফর্ম থেকে বের হচ্ছে, কেউ ঢুকছে। কুলিদের ব্যাগ নিয়ে টানাটানি দড়কথাকষি । এসব দৃশ্য আমার কাছে একেবারেই নতুন। বিশাল ট্রেন দেখে আমি হতবাক।

আরো পড়োঃ

ট্রেনের ভেতরের অবস্থা 

অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা আমাদের বগিটি খোঁজে পেলাম। বাবার নির্দেশে আমরা বগিতে প্রবেশ করলাম। সুসজ্জিত চেয়ারের সারি। কেউ সিট খোঁজছে, কেউ সিট নিয়ে বসেছে। কেউ সেলফের ওপর লাগেজপত্র রাখছে । আমরা আমাদের নির্ধারিত আসনে বসলাম। ভিন্ন এক অনুভূতি। নারী-পুরুষ, শিশুবৃদ্ধ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রী হয়ে ট্রেনে ওঠেছেন। আমি জানালার পাশে আসন নিলাম। সবুজ পতাকার সংকেতে নির্ধারিত সময়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে ‘পারাবত’ কমলাপুর স্টেশন ত্যাগ করলো। মন্থর গতি। ধীরে ধীরে গতিবেগ বাড়তে লাগলো ।

বিভিন্ন স্টেশন 

পৌষের হিমশীতল সকাল। শীতের পোশাকে যাত্রীদের খুব জড়সড় লাগছিল। আমি স্বচ্ছ কাচের জানালা দিয়ে বাইরে চোখ রাখলাম। খিলগাঁও, তেজগাঁও, মহাখালী, ক্যান্টনমেন্ট পেরিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ট্রেনটি পৌছে গেল বিমানবন্দর স্টেশনে। সেখানে ট্রেনটি পাঁচ-সাত মিনিটের জন্য থামলো। কিছু যাত্রী নেমে গেল, কিছু যাত্রী ওঠলো। যাত্রীদের উঠা-নামা শেষে ট্রেনটি হুইসেল বাজিয়ে আবার চলতে শুরু করলো। টঙ্গী, পূর্বাইল, ভৈরব প্রভৃতি স্টেশন অতিক্রম করে ট্রেনটি চলতে লাগলো ৷ 

ট্রেন থেকে কুয়াশা ভেদ করে এক সময় লালসূর্য দেখা দিল। রেললাইনের ধারে ধারে বিস্তৃত হয়ে আছে নানা দৃশ্য। গাছপালা যেন পেছনে দৌড়াচ্ছিল। রেললাইনের ধারে মানুষের ঘরবাড়ি, দালান-কৌঠা, দোকানপাট। কখনো গ্রাম, কখনো বিশাল মাঠ। ভৈরব ব্রিজ যখন অতিক্রম করছিল-নদী বক্ষের সে দৃশ্য বড়ই মনোরম হয়ে চোখে ধরা পড়ে। ঘণ্টা দুই একটানা চলার পর হবিগঞ্জ জেলায় প্রবেশ করে ‘পারাবত’ এক সময় থেমে পড়লো। বাবা বললেন বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রেনকে সাইড দেওয়ার জন্য ট্রেনটি এখানে দাঁড়িয়ে আছে। যে জায়গায় ট্রেনটি থেমেছিল আমার জানালার অদূরেই ছিল একটি গ্রাম্য পাড়া। মনে হচ্ছিল বাড়িগুলোর উঠোন দিয়েই যেন ট্রেন চলার পথ। খড়ের গাঁদা, টিনের চালাঘর আমার মন কাড়ছিল। গ্রাম্য বৌ-ঝিদের উঠোনে কাজ করতে দেখা যাচ্ছিল। শীতের সূর্য তখন আকাশের অনেক উঁচুতে ওঠে গেছে। অল্পক্ষণ পরেই স্থির দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের ট্রেনটির পাশ দিয়ে ধকাধক ঝিকঝিক্ করতে করতে বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রেনটি চোখের পলকে পাড় হয়ে গেল। আমাদের ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করলো।

দৃশ্যপটের পরিবর্তন 

হবিগঞ্জ পেরিয়ে শ্রীমঙ্গল পৌঁছতেই ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তনসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনটা খুব ভালোভাবেই চোখে পড়লো। উঁচু উঁচু পাহাড় আর চা বাগানের দৃশ্য খুবই মনোরম। কোথাও কোথাও চা-পাতা সংগ্রহের দৃশ্যও চোখে পড়লো। পাহাড়ের গা জুড়ে চা বাগানের যে বিন্যস্ত সৌন্দর্য চোখে পড়লো তা কোনোদিন ভোলার নয়। সে যেন চিত্রপটে আঁকা ছবি।

উল্লেখযোগ্য স্থান 

ট্রেন ভ্রমণের সুদীর্ঘ যাত্রাপথে উল্লেখযোগ্য স্থান ও স্থাপনার মধ্যে প্রথমেই পড়লো কমলাপুর রেলস্টেশন। এ স্টেশনের বিশালত্ব এবং স্থাপত্যশৈলী চোখে পড়ার মতো। দীর্ঘতম প্লাটফর্ম আছে এ স্টেশনে। কমলাপুর রেলস্টেশনের পরে চোখে পড়ে চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা বা এফডিসি। তেজগার পর মহাখালী ফ্লাইওভার, হজরত শাহজালাল (র) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, ভৈবর ব্রিজ, আশুগঞ্জ, সার কারখানা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা । 

ট্রেনের গতি ও নানা দৃশ্য 

কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সংকেত পাওয়ার পর একটু গা ঝাড়া দিয়ে হেলে-দুলে ট্রেনটি চলতে শুরু করলো। গতি খুব মন্থর। বাবা বললেন, ‘একটু পরেই গতি বাড়বে। বিমানবন্দর স্টেশন পেরোলেই সাঁই সাঁই করে দ্রুত গতিতে ছুটে চলবে। বাস্তবেও তাই দেখলাম। দু’পাশের ঘর-বাড়ি ও সাইনবোর্ডগুলো যেন পেছনে দৌড়াচ্ছে। ট্রেনের ভেতরের দৃশ্যও উপভোগ্য। যাত্রীরা কেউ গল্প করছে, কেউ ঝিমোচ্ছে, কেউ বেগুরে ঘুমুচ্ছে। বাদাম বিক্রেতা, চা-বিক্রেতা, জুতা পলিশওয়ালা, পেপার বিক্রেতা, ওষুধ বিক্রেতার আনাগোনা লেগেই আছে। এক অন্ধ ভিখারি একতারা বাজিয়ে গান গাচ্ছিল সেই গানের সুর এখনো আমার স্মৃতিপথে গেঁথে আছে।

শেষ স্টেশন 

দেখতে দেখতে দীর্ঘ পথ শেষ হয়ে এলো। বাবা বললেন, ‘আর মিনিট পনেরোর মধ্যেই আমরা সিলেট রেলস্টেশনে পৌঁছে যাব।’ যাত্রীদের মধ্যেও একটা চঞ্চলতা লক্ষ করলাম। যে যার ব্যাগপত্র, পুটলি-পুটলা গুছিয়ে নিচ্ছে। আমরাও আমাদের ব্যাগগুলো গুছিয়ে হাতের নাগালে রাখলাম। ট্রেন তার শেষ গন্তব্যে পৌঁছে গেল। লাল-শার্ট পরা কুলিরা এলো। বড় দুটি ব্যাগ বাবা দু’জন কুলিকে বুঝিয়ে দিলেন। বাবা কুলি দুজনকে অনুসরণ করলেন। আমরা বাবাকে অনুসরণ করে ট্রেন থেকে সিলেট রেলস্টেশনে নেমে পড়লাম । শেষ হলো আমাদের আনন্দময় সুদীর্ঘ ট্রেন ভ্রমণ। 

উপসংহার 

বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা আর আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে সেদিন শেষ হয়েছিলো আমার প্রথম ট্রেনে ভ্রমণ। পথের বিচিত্র সৌন্দর্য, ওঠা-নামা, ফেরিওয়ালা হাঁফডাক এখনো আমার স্মৃতিলোকে অম্লান। 

আশা করি আজকের পোস্টটি তোমাদের ভালো লেগেছে। তুমি যদি অন্য কোনো রচনা চাও তাহলে আমাদের কমেন্টের মাধ্যমে জানাও। ধন্যবাদ।

Related posts

পত্রঃ তুমি কেন একজন কম্পিউটার প্রকৌশলী হতে চাও তার কারণ বর্ণনা করে বন্ধুকে চিঠি লেখ

Swopnil

রচনাঃ বাংলাদেশের জনসংখ্যা সমস্যা

Swopnil

সারমর্মঃ সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা

Swopnil

Leave a Comment