রচনানির্মিতি

রচনাঃ শ্রমের মর্যাদা

শ্রমের মর্যাদা

আজকের পোস্টে আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রচনা শেয়ার করব “শ্রমের মর্যাদা বাংলা রচনা“। এই রচনাটি আশা করি তোমাদের পরীক্ষায় কমন আসবে। আমরা এই রচনাটি যত সম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করেছি – তোমাদের পড়তে সুবিধা হবে। চলো শুরু করা যাক।

শ্রমের মর্যাদা

ভূমিকা 

কর্মই জীবন। কর্মহীন জীবন অচল, অসার। অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে এবং আত্মপ্রকাশের অভিযাত্রায় মানুষকে সফল হতে হলে তাকে বহুবিধ কর্ম সম্পাদন করতে হয়। নিজের প্রয়োজনকে ছাপিয়ে এ কর্মপ্রয়াস জাতীয় উন্নতির স্রোতধারায় বেগ সঞ্চার করে। বহু মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্মপ্রয়াসই জাতিকে জড়তা কাটিয়ে প্রগতির দিকে ধাবিত করে। তাই ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে কর্মের মূল্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কর্মসাধনা শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও বটে। আধুনিককালে শারীরিক শ্রমের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম তথা মানসিক শ্রম সর্বক্ষেত্রে উন্নতির শ্রেয়তর অবলম্বন বলেই স্বীকৃত। তাই প্রতিটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রকার শ্রমকেই পরম শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করতে হবে।

শ্রমের সাথে জীবনের যোগসূত্র 

শ্রম ও জীবনের সম্পর্ক নিবিড়। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মায় ক’জন? সবাইকে তো মাথার ঘাম পায়ে কেলেই জোগাড় করতে হয় মুখান্ন। অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে পরিশ্রমই জীবনের একমাত্র সঙ্গী। বৃহত্তর পরিসরে নিজের জীবনকে বিকশিত করার জন্য সাধারণ শ্রমে কাজ হয় না, চাই কঠোর পরিশ্রম।

উপনিষদে বলা হয়েছে, ‘শ্রম বিনা শ্রী হয় না’।

প্রকৃতপক্ষে শ্রমের বিনিয়োগ ছাড়া জীবনের কোনোরূপ শ্রীবৃদ্ধিই ঘটে না। জন্মের পর মানব শিশু যখন তার অস্তিত্বের ঘোষণা দেয় তীব্র কান্নার স্বরে তখন থেকেই তার পরিশ্রম শুরু। ধরো ধরো পায়ে প্রথম পদক্ষেপে হাঁটতে শেখার মধ্য দিয়ে শারীরিক শ্রমে জীবন বিকাশের সূচনা। তারপর আমৃত্যু তাকে ঘাম নিংড়িয়েই জগৎ-সংসারে টিকে থাকতে হয়। এ শ্রম শারীরিক ও মানসিক দুভাবেই বিনিয়োগ হতে পারে। মানবজীবন বস্তুত একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরিধি এবং এ সময়টুকু ব্যয় করার উত্তম পন্থা হচ্ছে শ্রমের মধ্যে ডুবে থাকা।

See also  অনুচ্ছেদঃ চায়ের দোকান

শ্রমের প্রকারভেদ 

শ্রম হলো কোনোকিছু উৎপাদনের পেছনে মানুষের শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিগত দক্ষতার প্রয়োগ। সাধারণভাবে শ্রম কথাটি শারীরিক পরিশ্রমকেই নির্দেশ করে, কিন্তু মানুষের শ্রম কেবল শারীরিক নয়। এর কারণ মানুষ বুদ্ধিমান, চিন্তাশীল ও সৃষ্টিশীল প্রাণী। এটা তাকে দেহসর্বস্ব প্রাণিরূপে সৃষ্টি করেননি, বরং বুদ্ধির জোরে বিশ্বজয়ের অধিকার দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাই – মানুষকে শারীরিক শ্রমের সাথে সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রনও জীবনের প্রয়োজনে নিয়োগ করতে হয়। এ কথা সত্য, শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রন ব্যক্তিবিশেষের জন্য আলাদাভাবে করে বরাদ্দ করা হয়নি। বরং দু’ধরনের শ্রমকেই সকলকে জীবনের অপরিহার্য ভাবতে হয় । তবে শিক্ষা-দীক্ষা, পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান মানুষের শারীরিক শ্রমকে লাঘব করায়। কিন্তু শারীরিক শ্রমের চেয়ে মানসিক শ্রম অনেক ক্লান্তিকর এবং অনেক বেশি মূল্যবান ।

পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি 

আমাদের জীবন কোনো ফুলশয্যা নয়। চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে বাধার কাঁটা এবং নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের ঘনঘটা। এসব মোকাবেলা করে নিজের জীবনকে অস্তিত্বমান করে রাখাটাও দুরূহ বিষয়। তারপর যদি কেউ অসংখ্য হতভাগ্যের মধ্যে নিজের কপালে সৌভাগ্যের তিলক পরাতে চায় তাহলে তাকে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাগ্যের দেবতার আরাধনা করলে চলবে না। উপরন্তু পৃথিবীর মাটিকে ঘামে সিক্ত করেই সৌভাগ্যের পথ তৈরি করতে হয়। 

কথায় আছে, Industry is the mother of good luck. 

বস্তুত সৌভাগ্য দুর্ভাগ্য বলে কোনো অলৌকিক বিষয় নেই। এ দুটি বিষয় মানুষের কর্মকাণ্ডেরই ফলশ্রুতি মাত্র। কঠোর পরিশ্রম করলে ক্ষেত্র বিশেষে ব্যর্থ হলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে সাফল্য ধরা দেবেই। কিন্তু হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে এবং পরিশ্রমকে ভয় পেলে জীবনের স্বাভাবিক শক্তি-ক্ষমতার অপচয় হয় এবং পরিণতিতে দুর্ভাগ্য এসে ঘিরে ধরে। পৃথিবীর ইতিহাসে যারা স্বনামখ্যাত রূপে অমর হয়ে আছেন, তাঁদের জীবন পর্যালোচনা করলে শ্রমশীলতা ছাড়া আর কোনো জাদুর চেরাগই পাওয়া যাবে না। 

আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন— 

তিনি কোনো জাতির ভাগ্যই পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ সে জাতি ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যে চেষ্টা না করে।

শ্রমশীলতা দেশে-বিদেশে 

পৃথিবীতে যেসব জাতি উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করেছে তাদের উন্নতির পেছন কোনোকিছুই নেই, কেবলই আছে বহু মানুষের নিরন্তর পরিশ্রমের অবদান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল গোটা জাপান। সৈ দেশে মূল্যবান কোনো প্রাকৃতিক সম্পদও নেই। কিন্তু মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে দেশটি যে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে তার পেছনে রহস্য বলতে একটিই—জনগণের শ্রমশীলতা। এখনও জাপানিরা গড়ে প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম করে। বসে থাকা, আড্ডা দেওয়া, কর্ম ফাঁকি দেওয়া কী তারা জানে না। তারা শুধুই খাটে আর খাটে। কোরিয়া, মালয়েশিয়া, চীন প্রভৃতি উদীয়মান দেশে শ্রমই জাতীয় উন্নতির চাবিকাঠি বলে স্বীকৃত। তারা বিশ্বাস করে পরিশ্রম করে গেলে উন্নতি আসবেই। অপরদিকে আমাদের দেশে গোঁফ—খেজুরে মানুষের সংখ্যা বেশি। শারীরিক শ্রম এদেশে ঘৃণার বিষয়, মানসিক শ্রমেও সহজেই ঘটে ধৈর্যচ্যুতি। কাজের চেয়ে কথা বেশি বলে আমাদের যথেষ্ট দুর্নাম রয়েছে। পরিণতিতে স্বাধীনতার এত বছর পরও যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা আজ পর্যন্ত দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে ঘুরপাক খাচ্ছি। আমাদের দেশে সবাই সংক্ষিপ্ত পথে বড় হতে চায় কিন্তু পরিশ্রম ছাড়া সংক্ষিপ্ত কোনো পথ জীবনের উন্নতিতে নেই। বিদেশে ঘরে বাইরে পিয়ন, চাপরাশি, ভৃত্য, বেয়ারার ছড়াছড়ি নেই। নিজ হাতেই সবাই জীবনের সব কাজ করে, এতে লজ্জার কিছু নেই ।

See also  রচনাঃ ইন্টারনেট

শ্রমের মর্যাদা 

পরিশ্রমে অগৌরবের কিছু নেই। অগৌরব হয় আলস্যে এবং মূল্যবান জীবনকে বৃথা নষ্ট করায়। পৃথিবীর সভ্যতার চাকা ঘুরেছে মানুষের শারীরিক শ্রমে, পরবর্তীতে বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটেছে বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের সাহায্যে। উষর ধরণির বুকে ফসলের সম্ভার ফোটিয়েছে শ্রমশীল মানুষের পেশিবহুল হাত। পরিশ্রমী মানুষই পৃথিবীকে মনুষ্য জাতির জন্য বাসযোগ্য করে তুলেছে, জঙ্গল কেটে গড়ে তুলেছে নগরসভ্যতা। অবকাঠামোগত যা কিছু উন্নতি হয়েছে তার পেছনেও রয়েছে পরিশ্রমের অবদান । 

শ্রমজীবী মানুষের বন্দনায় নজরুল গেয়েছেন—

“গাহি তাহাদের গান –

ধরণীর বুকে দিল যারা আনি ফসলের ফরমান

শ্রম কিণাঙ্ক কঠিন যাদের নির্দয় মুঠি তলে

এস্তা ধরণী নানা দেয় ডালিভরে ফুলে ফলে ।

মহানবি (স.) বলেন –

‘নিজ হাতে পরিশ্রম-লব্ধ আহারের চেয়ে উত্তম আহার কেউ খায়নি।’ 

পরিশ্রমী মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। তাকে পাপ স্পর্শ করতে পারে না, তাপ ছুঁতে পারে না। সব সাধকের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সাধক পরিশ্রমী মানুষ। শ্রমের সাধনা ব্যক্তিগত পর্যায়ে ছাপিয়ে জাতিকে পর্যন্ত উন্নতির জাদুর কাঠি বুলিয়ে দেয়।

মহৎ ব্যক্তিদের জীবনে শ্রম 

পৃথিবীর ইতিহাস যারা মহান ব্যক্তি বলে স্বীকৃত এবং অমরত্ব লাভ করেছেন, তাঁরা সবাই ছিলেন শ্রমশীল। বিশেষ করে শারীরিক পরিশ্রমে তাদের কোনো দ্বিধা ছিল না। মহানবি হজরত মুহম্মদ (স.) ইহুদির বাড়িতে কাজ করে মুখান্ন জোগাড় করেছেন। নবি তনয়া ফাতিমা (রা) নিজ হাতে যাঁতা ঘুরিয়ে আটা ভাঙতে গিয়ে হাতে ফোস্কা ফেলে দিয়েছেন। সুলতান নাসিরউদ্দীন মাহমুদ ও সম্রাট আওরঙ্গজেব নিজ হাতে টুপি তৈরি করে এবং কুরআন নকল করে জীবিকার সংস্থান করেছেন। মহাত্মা গান্ধী আজীবন নিজ হাতে সকল কর্ম সম্পাদন করেছেন। সত্যাগ্রহ আন্দোলনে হেঁটেছেন মাইলের পর মাইল । প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন এবং উড্রো উইলসন এমন কোনো কাজ নেই যে নিজ হাতে করেননি। মাত্র কয়েক বছর আগে পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট লেস ওয়ালেসা মেয়াদপূর্তি শেষে তাঁর সাবেক কর্মস্থল শিপ ইয়ার্ডে ফিরে গিয়ে হাতুড়ি ধরেছেন হাতে। 

See also  ভাবসম্প্রসারণঃ জ্ঞানহীন মানুষ পশুর সমান

উপসংহার 

পরিশ্রমকে অশ্রদ্ধার চোখে দেখে তারাই যারা হীনম্মন্য এবং মূর্খ। আমাদের দেশে এখনো সবাই কোনো দাপ্তরিক কাজের আশায় দীর্ঘদিন বেকারত্বের গ্লানি ভোগ করে জীবনকে বিষিয়ে তোলে। অথচ তাদের সামনেই পড়ে থাকে শারীরিক শ্রমে নিয়োজিত হয়ে জীবন ধারণের প্রচুর সুযোগ। এর ফলে দেশে বেকারত্ব বাড়ছে, বাড়ছে নানা প্রকার সামাজিক অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা । ফলে আমাদের কাঙ্ক্ষিত জাতীয় উন্নতি থেকে যাচ্ছে অধরা। তাই আমাদের সবাইকে শারীরিক ও মগজগত উভয় প্রকার শ্রমকেই শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করতে হবে।

আশা করি আজকের পোস্টটি তোমাদের ভালো লেগেছে। তুমি যদি অন্য কোনো রচনা চাও তাহলে আমাদের কমেন্টের মাধ্যমে জানাও। ধন্যবাদ।

Related posts

সারমর্মঃ বিশ্ব-জোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র

Swopnil

অনুচ্ছেদঃ  পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য

Swopnil

ভাবসম্প্রসারণঃ উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে

Swopnil

Leave a Comment