নির্মিতিরচনা

রচনাঃ বৃক্ষরোপণ অভিযান

বৃক্ষরোপণ অভিযান / পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন

আজকের পোস্টে আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রচনা শেয়ার করব “বৃক্ষরোপণ অভিযান / পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন“ এই রচনাটি আশা করি তোমাদের পরীক্ষায় কমন আসবে। আমরা এই রচনাটি যত সম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করেছি – তোমাদের পড়তে সুবিধা হবে। চলো শুরু করা যাক।

বৃক্ষরোপণ অভিযান / পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন

ভূমিকা

‘অসীম শান্তির মাঝে প্রাণের সাধের গেহ

তরুর শীতল ছায়া, বনের শ্যামল স্নেহ।’

প্রাণিকুলের অস্তিত্বের প্রয়োজনে প্রকৃতিতে বৃক্ষের অবস্থান অপরিহার্য। মনোরম পৃথিবীর নয়নমুগ্ধ সৌন্দর্যের বিরাট এক অংশ অধিকার করে আছে বৃক্ষরাজি। বৃক্ষ পৃথিবীকে করে তুলেছে সুন্দর, সজীব স্পন্দনময় — শ্যামল স্নিগ্ধতায় ভরে দিয়েছে পৃথিবীর মৃত্তিকা বক্ষ প্রয়োজনীয়তা : বৃক্ষ কেবল নৈসর্গিক সৌন্দর্যের উৎস নয়— বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা প্রাণিকুলের অস্তিত্ব এবং জীবন ধারণের বৃক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বৃক্ষ নির্মল বায়ু ও অক্সিজেন দিয়ে প্রাণিকুলের অস্তিত্বকে সংরক্ষণ করছে। বৃক্ষ আবহাওয়া ও জলবায়ুর নিয়ন্ত্রণ করে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখে । বৃক্ষ বাতাসে জলীয়বাষ্পের ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং বৃষ্টিপাতে সাহায্য করে। ভূমির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি এবং ভূমি ক্ষয়রোধে বৃক্ষের কার্যকারিতা অপরিসীম। ঝড়-ঝঞ্জা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে বৃক্ষ ঘরবাড়ি ও আবাস গৃহকে রক্ষা করে ৷ গৃহ নির্মাণ, জ্বালানি এবং আসবাবপত্র তৈরিতে বৃক্ষের চাহিদা ব্যাপক । আমাদের ব্যবহারিক জীবন ও অর্থনীতিতে বৃক্ষের উপকারী ভূমিকা অনিঃশেষ ।

বৃক্ষজাত আসবাব ও অন্যান্য উপকরণ 

ঘর-বাড়ি নির্মাণ, খাট-পালং, চেয়ার-টেবিল, আলমারি, নৌকা, গরুর গাড়ি, বাস-ট্রাক নির্মাণে কাঠের ব্যবহার প্রচুর। প্যাকিং বক্স, কাগজ, দিয়াশালাই প্রভৃতি শিল্পে বৃক্ষ কাঁচামালের যোগান দিয়ে থাকে। দৈনন্দিন জীবনে নিঃশর্তভাবে আমাদের নানা প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে। বৃক্ষ মানুষের প্রয়োজনে যে কাঠ ও বাঁশ যোগান দিয়ে থাকে তা আমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আবশ্যক ।

খাদ্যের উৎস হিসেবে বৃক্ষ 

বৃক্ষ কেবল ঘর-বাড়ি নির্মাণ; জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামাল হিসেবেই ব্যবহৃত হয় না— খাদ্যের উৎস হিসেবেও বৃক্ষের অবদান অমূল্য। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, কমলা, আপেল, নারিকেল, নাশপতি, জামরুল, জাম্বুরা, কুল, পেয়ারা, তাল, জাম্বুল, চালিতা, সুপারি, তেঁতুল প্রভৃতি রকমারি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফলের উৎস বৃক্ষ ।

বাংলাদেশের বৃক্ষরাজি ও বনভূমি 

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরাজি ও বনভূমির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম । বাংলাদেশের আয়তন অনুপাতে কমপক্ষে শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি প্রয়োজন কিন্তু বাংলাদেশে এর পরিমাণ মাত্র ৯ ভাগ। উল্লেখ্য যে, ‘সুষম প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্যে একটি দেশের মোট আয়তনের ৩৬ শতাংশ বন দরকার । বিজ্ঞানীদের মতে, এ হার ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়। বাংলাদেশের বনভূমির রূপ বিচিত্র। প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখে এ দেশের সমতল ভূমি, পাহাড়ি এলাকা গড়াঞ্চল ও সাগর তীরে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বনভূমি গড়ে ওঠেছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সুন্দরবন বনাঞ্চল গড়ে ওঠেছে। সুন্দরবনের সুন্দরী, কেওড়া, গেওয়া প্রভৃতি কাঠ উল্লেখযোগ্য । দেশের পার্বত্য জেলাসমূহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে প্রায় পনেরো হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বনভূমি রয়েছে। এখানে সেগুন, গামারি প্রভৃতি মূল্যবান কাঠসহ প্রচুর বাঁশ ও বেত জন্মে। মধুপুর গড়, ভাওয়াল গড়, রংপুর ও দিনাজপুরেও বনাঞ্চল রয়েছে। শাল, গজারিসহ নানা প্রকার গাছ এসব বনাঞ্চলে উৎপন্ন হয়। এছাড়াও গোটা দেশ জুড়ে আম, জাম, কাঁঠাল, কড়ই, তাল, তমাল, নারিকেল প্রভৃতি নানা জাতের গাছ রয়েছে।

বাংলাদেশে বৃক্ষ স্বল্পতা ও প্রতিক্রিয়া 

বাংলাদেশে আয়তনের তুলনায় যে পরিমাণ বৃক্ষ পরিমণ্ডল ও বনভূমি থাকার কথা ছিল তা নেই। যা আছে তাও আবার নানাভাবে বিনষ্ট, উচ্ছেদ ও ধ্বংস হচ্ছে। জ্বালানি ও ইট ভাটায় বছরে প্রচুর পরিমাণ বৃক্ষ ধ্বংস হচ্ছে । মানুষের ঘর-বাড়ি নির্মাণ ; দালানকোঠা তৈরিতে প্রচুর পরিমাণ কাঠ ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৃক্ষ উচ্ছেদ হচ্ছে। বৃক্ষ উচ্ছেদের কারণে প্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, ঝড়-ঝঞ্ঝা প্রভৃতি প্রকৃতির বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ফল। বৃক্ষ-স্বল্পতার কারণে ঋতুও তার আপন বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলছে। ফলে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হচ্ছে। বৃক্ষ উচ্ছেদ ও প্রয়োজনীয় পরিমাণ বৃক্ষ না থাকার কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে মরুবৈশিষ্ট্য দিন দিন প্রভাব বিস্তার করছে। উপরন্তু গোটা বাংলাদেশের শস্য ক্ষেত্র রুক্ষ ও অনুর্বর হয়ে পড়ছে। প্রকৃতির এ বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রভাব জনজীবনকেও দিন দিন অতিষ্ঠ করে তুলছে।

বৃক্ষরোপণ ও বনায়নের প্রয়োজনীয়তা 

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, খাদ্যাভাব দূর করা এবং বন্যা-ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন প্রক্রিয়া চালু করা প্রয়োজন। বৃক্ষরোপণ ও বনায়নের জন্য সরকারি কর্মসূচির বাইরে সাধারণ জনগণকেও সচেতন ও উদ্যোগী হতে হবে। বাড়ির আশপাশে, পতিত জায়গায়, রাস্তার দু’ধারে বৃক্ষ রোপণ করতে হবে। যেসব বনভূমি বিনষ্ট বা উচ্ছেদ হয়েছে সেখানে নতুন করে বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে কাজে লাগিয়ে দেশে বৃক্ষের হার বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে সরকার প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বৃক্ষরোপণ অভিযান চালু করেছে। এ অভিযান সফল করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিভাগ ছাড়াও দেশের সর্বস্তরের জনগণের। বৃক্ষরোপণ অভিযানের মাধ্যমে ফলজ ও বনজ চারা রোপণের কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে।

উপসংহার 

বৃক্ষ মানুষের পরম উপকারী বন্ধু। আমাদের বেঁচে থাকা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জীবন যাত্রার মানোন্নয়নে বৃক্ষের অবদান অপরিসীম । বাংলাদেশের যে নৈসর্গিক শোভা দিন দিন অস্তমিত হতে চলেছে বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষনিধন বন্ধের মাধ্যমে সেই হারানো পরিবেশকে আবার পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। বৃক্ষ কেবল সবুজ সতেজতা নয়— বৃক্ষের বহুমুখী উপকারিতায় মানব ও প্রাণিকুল ধন্য । তাই যেকোনো মূল্যেই দেশের বনায়ন ও বৃক্ষরোপণ অভিযানকে সফল করে তুলতে হবে।

আশা করি আজকের পোস্টটি তোমাদের ভালো লেগেছে। তুমি যদি অন্য কোনো রচনা চাও তাহলে আমাদের কমেন্টের মাধ্যমে জানাও। ধন্যবাদ।

Related posts

অনুচ্ছেদঃ রিকশাওয়ালা

Swopnil

অনুচ্ছেদঃ বাংলা নববর্ষ

Swopnil

ভাবসম্প্রসারণঃ কত বড় আমি’ কহে নকল হীরাটি, তাই তো সন্দেহ করি, ‘ নহ ঠিক খাঁটি ‘

Swopnil

Leave a Comment