রচনাঃ আমার প্রিয় কবি বা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম

Posted by

আজকের পোস্টে আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রচনা শেয়ার করব “আমার প্রিয় কবি বা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা রচনা“। এই রচনাটি আশা করি তোমাদের পরীক্ষায় কমন আসবে। আমরা এই রচনাটি যত সম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করেছি – তোমাদের পড়তে সুবিধা হবে। চলো শুরু করা যাক।

সূচনা

ছোটোবেলায় বাবার মুখে শুনতাম :

ভোর হলো, দোর খোল, খুকুমণি ওঠ রে!

ঐ ডাকে জুঁই শাখে ফুলখুকি ছোট রে।

আমি ভেবে নিয়েছিলাম, এই সুন্দর কবিতাটি আমার বাবাই রচনা করেছেন। পরে জেনেছি, এ কবিতাটি কাজী নজরুল ইসলামের। এরপর একে একে মুখস্থ করে ফেললাম নজরুলের ‘খুকু ও কাঠবিড়ালি’, ‘লিচু চোর’সহ অনেক কবিতা। অতিথি এলেই হাত নেড়ে নেড়ে আবৃত্তি করে শোনাতাম। ‘বাবুদের তাল পুকুরে/হাবুদের ডাল কুকুরে।” তখন থেকেই আমার প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ।

নজরুলের জন্ম ও শৈশব

নজরুলের জন্ম বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে ২৪ মে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে। পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মা জাহেদা খাতুন। চার পুত্রের অকালমৃত্যুর পর নজরুলের জন্ম হওয়ায় তাঁর নাম রাখা হয় ‘দুখু মিয়া’। নজরুলের শৈশব কেটেছে দুঃখ-দৈন্যের মধ্য দিয়ে।

কবির শিক্ষাজীবন

ছেলেবেলা থেকেই নজরুল ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। গ্রামের মক্তব থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর তিনি ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর হাই স্কুলে কিছুকাল পড়ালেখা করেন। এরপর ভর্তি হন বর্ধমান জেলার রানীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে। দশম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি ৪৯ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করেন। নজরুলের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার এখানেই ইতি ঘটে।

কবির কর্মজীবন

নজরুলের কর্মজীবন নানা বৈচিত্র্যে ভরা। বারো বছর বয়সে তিনি লেটো গানের দলে যোগ দেন। সেখান থেকে তাঁর সামান্য কিছু রোজগার হতো। এরপর আসানসোলের এক রুটির দোকানে মাসিক এক টাকা বেতনে চাকরি নেন। বাঙালি পল্টনে সৈনিক হিসেবে কর্মরত থাকার সময় থেকেই সাহিত্যচর্চার প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। সেনাবাহিনী ত্যাগের পর তিনি কাব্যসাধনায় পুরোপুরি নিয়োজিত হন। সাংবাদিক হিসেবেও তিনি যথেষ্ট কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় নবযুগ, লাঙল ও ধূমকেতুর মতো জনপ্রিয় পত্রিকাগুলো।

কবির কাব্যপ্রতিজ্ঞা

কবিতার জগতে নজরুল এক অনন্য নাম। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতার নাম ‘মুক্তি’। কিন্তু তাকে সর্বাধিক খ্যাতি এনে দেয় ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি। পরবর্তীতকালে এই কবিতার কল্যাণেই বিদ্রোহী কবি হিসেবে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি রচনা করে তিনি ব্রিটিশ শাসকদের ব্যঙ্গ করেছিলেন। এ কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছিল।

বাংলা সাহিত্যে নজরুলের অবদান

বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে নজরুলের আবির্ভাব ঝোড়ো হাওয়ার মতো। তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করেছিলেন। দেশব্যাপী যখন পরাধীনতার অন্ধকার, তখন তিনি লিখলেন:

কারার ঐ লৌহকপাট

ভেঙে ফেল কররে লোপাট।

তারুণ্যের কবি জরাগ্রস্ত পুরোনো সবকিছু ভেঙে নতুন সমাজ গড়ার কথা বলেছেন এ কবিতায়। ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাশি’, ‘ফণীমনসা’, ‘সর্বহারা’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ তাঁর বিদ্রোহী চেতনারই জয়ধ্বনি। বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর পরিচিতি বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে।

নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী কবি। নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের প্রতি ছিল তাঁর গভীর সমবেদনা। ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় কবি বলেছেন:

দেখিনু সেদিন রেলে

কুলি বলে এক বাবু সাব তারে ঠেলে দিল নিচে ফেলে! এমনি করে জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?’

চোখ ফেটে এলো জল

দেশকে তিনি ভালোবেসেছেন অন্তর দিয়ে। দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামে অংশ নিয়ে কারাবরণ করেছেন, তবুও জননী জন্মভূমির অসম্মান সহ্য করেননি।

নারী ও পুরুষ নজরুলের চোখে ছিল সমান, নারী-পুরুষের সাম্য নিয়ে তিনি লিখেছেন:

“বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’

নজরুলের অসাধারণ শিল্পীসত্তার পরিচয় মেলে তাঁর রচিত অসংখ্য গানে। এছাড়া গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস ইত্যাদিতেও তাঁর অসামান্য প্রতিভার ছাপ রেখেছেন তিনি। সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার।

সংবর্ধনা, সম্মাননা ও পুরস্কার

নজরুল জীবনে অনেক সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেন। ১৯২৯ সালে কলকাতা অ্যালবার্ট হলে নজরুলকে জাতির পক্ষ থেকে সম্মাননা দেওয়া হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৪৫ সালে নজরুলকে – ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ প্রদান করে। ১৯৬০ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৫ সালে তাঁকে ডি.লিট উপাধি প্রদান করে। ১৯৭৬ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন।

কবির অসুস্থতা

মাত্র ৪৩ বছর বয়সে কবি মস্তিষ্কের পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হলেও তাঁকে সুস্থ করা সম্ভব হয়নি। এর পর থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন নির্বাক।

নজরুলের শেষ জীবন ও জাতীয় কবির মর্যাদা লাভ

আর্তপীড়িত মানবতার কবি নজরুল শেষজীবনে প্রচণ্ড কষ্ট ভোগ করেছেন। ১৯৪১ সালে দুরারোগ্য ‘পিস্ ডিজিজ’-এ আক্রান্ত হলে তাঁর মস্তিষ্ক বিকল হয়ে যায়। বাকশক্তি সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলেন তিনি। এরপর দীর্ঘ ৩৫ বছর বেঁচে ছিলেন।

আরও পড়োঃ

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের একান্ত আগ্রহে কবিকে কলকাতা থেকে ঢাকায় আনা হয়। দেওয়া হয় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ও জাতীয় কবির মর্যাদা। ১৯৭৬ সালে তিনি ঢাকায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়।

উপসংহার

মানুষের সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখা মানুষ কবি নজরুল। সাম্য, মৈত্রী ও মানবতার স্বপ্ন দেখা মানুষ তিনি। তাই তিনি আমার প্রিয় কবি।

আশা করি আজকের পোস্টটি তোমাদের ভালো লেগেছে। তুমি যদি অন্য কোনো রচনা চাও তাহলে আমাদের কমেন্টের মাধ্যমে জানাও। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *