Regular Contentরচনা

রচনাঃ বাংলাদেশের ফুল

বাংলাদেশের ফুল (১০০% কমন)

আজকের পোস্টে আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রচনা শেয়ার করব “বাংলাদেশের ফুল বাংলা রচনা“। এই রচনাটি আশা করি তোমাদের পরীক্ষায় কমন আসবে। আমরা এই রচনাটি যত সম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করেছি – তোমাদের পড়তে সুবিধা হবে। চলো শুরু করা যাক।

বাংলাদেশের ফুল

ভূমিকা 

ফুল অনাবিল সৌন্দর্যের প্রতীক। মোহনীয় লাবণ্য ও সুমধুর সুবাসের জন্য ফুল সকলের প্রিয়। সুপ্রাচীন কাল থেকেই মানুষ প্রীতি-প্রেম, উপহার-অঞ্জলি, পূর্জা-অর্চনার প্রতীক হিসেবে ফুল ব্যবহার করে আসছে। পৃথিবীর সকল দেশই ফুলের সৌন্দর্যে ভরপুর । সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশও ফুলের চোখ জুড়ানো রঙে ও রূপে পরিপূর্ণ। বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুপূর্ণ উর্বর ভূমিতে প্রতিটি ঋতুতেই প্রস্ফুটিত হয় নানাজাতের ফুল ।

ফুলের প্রকারভেদ 

ষড়ঋতুর বাংলাদেশ বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। এদেশের নদী-নালা, উন্মুক্ত-প্রান্তর, পাহাড়-অরণ্য ফুল উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশে সমৃদ্ধ। ঋতুতে ঋতুতে এখানে পাপড়ি মেলে নানাজাতের ফুল। শাপলা, গোলাপ, বেলি, চামেলি, জুঁই, টগর, হাসনাহেনা, বকুল, গন্ধরাজ, গাঁদা, জবা, শিমুল, পলাশ, মাধবী, মল্লিকা, সূর্যমুখী, দোলন চাঁপা, অশোক, কৃষ্ণচূড়া, পদ্ম, পারুল, কুন্দ, কলমি, কামিনী, কেতকী প্রভৃতি বাংলাদেশের নয়নমুগ্ধ ফুল।

শাপলা 

শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুল। শরৎকালে বাংলাদেশের বিল-ঝিল, ডোবা-দিঘি, হাওর-বাঁওড়ে প্রচুর শাপলা জন্মে। পদ্মফুলের সঙ্গে শাপলার মিল রয়েছে। শাপলা ফুলের রং সাদা। গাঢ় লাল ও গোলাপি রঙের শাপলাও দেখতে পাওয়া যায় । শাপলার পাতা গোলাকার, বোঁটা বা ডাটা লম্বা। শাপলার ফল ছোটো ছোটো বীজে পরিপূর্ণ। শাপলার পরিণত ফল ঢ্যাপ নামে পরিচিত। ঢ্যাপের খৈ বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় খাবার । শাপলার লম্বা কোমল,ডাঁটা সবজি হিসেবে খাওয়া যায়।

গোলাপ 

রূপ, সৌন্দর্য ও গন্ধে গোলাপ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় ফুল। বর্ণ-বৈচিত্র্যে, সৌরভে-সুগন্ধে সব ফুলের সেরা বলেই গোলাপকে ফুলের রানি বলা হয়। পৃথিবীতে প্রায় দুশ’ প্রজাতির গোলাপ রয়েছে। গোলাপ গাছের প্রকৃতি, ফুলের আকৃতি ও ফুল ফোটার ধরন বিচার করে গোলাপবিদরা গোলাপকে হাইব্রিড-টি, হাইব্রিড-পারপিচুয়াল, ক্লোরিবান্ডা, পলিয়েনথা, মিনিয়েচার প্রভৃতি জাতে ভাগ করেছেন। হাইব্রিড-টি ও ক্লোরিবান্ডা গোলাপের মধ্যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও জনপ্রিয় জাত। গোলাপ ফুল সারা বছর ধরেই ফোটে। এটি বহুবর্ষজীবী গুল্ম ও ঝোপ জাতীয় গাছ। গোলাপের পাতা অনেকটা ডিম্বাকৃতির, প্রান্তদেশ করাতের মতো খাঁজকাটা। রঙের দিক থেকে নানা রঙের গোলাপ রয়েছে। গোলাপি, লাল, কালো, হলুদ, সাদা, কমলা প্রভৃতি রঙের গোলাপ দেখা যায়। এছাড়াও দু’রঙা, মিশ্র ও বহু রঙা গোলাপও রয়েছে। গোলাপের আদিজাত ছিল জংলি বা বুনো। উদ্ভিদ বিজ্ঞানিগণ নানাজাতের গোলাপের সংকর দ্বারা আধুনিক জাতের গোলাপ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছেন।

জবা

জবা গুল্মজাতীয় বহুবর্ষজীবী ফুল গাছ। জবা ফুলের রং ভোরের রক্তরাঙা সূর্যের মতো টকটকে লাল। তবে সাদা, কমলা, হালকা-গোলাপি, সাদা-লাল রঙের জবাও দেখা যায়। জবা ফুলের পাতা গাঢ় সবুজ রঙের। আকৃতি অনেকটা ডিমের মতো। পাতার প্রান্তদেশ করাতের মতো দাঁতযুক্ত। জবার কোনো কোনো জাতের পাতা মিশ্র রঙেরও হয়ে থাকে। পূজা-অর্চনায় জবা ফুলের সমাদর খুব বেশি। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে প্রচুর জবা ফুল ফোটে। ঝুমকো জবা এবং লংকা জবা-জবা ফুলের দুটি আকর্ষণীয় প্রজাতি। জবা ফুলের আদি নিবাস চীন দেশ। আকর্ষণীয় রং ও অনুপম সৌন্দর্যের জন্য জবার কদর পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই রয়েছে।

টগর

টগর ধবধবে সাদা রঙের একটি আকর্ষণীয় ফুল। টগর ফুল সারা বছর ফুটলেও গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এ ফুল প্রচুর পরিমাণে প্রস্ফুটিত হয়। টগর গাছের আকৃতি ছোটো। টগর একটি গুল্মজাতীয় গাছ। পাতার আকৃতি অনেকটা বর্শার মতো। রং সবুজ, দেখতে চকচকে ও সুন্দর। টগর গাছ ফুলে ফুলে পরিশোভিত থাকে ।

বেলি

বেলি সুগন্ধযুক্ত সাদা রঙের ফুল। এটি গুল্মজাতীয় ঝোপবিশিষ্ট ফুল গাছ। কাণ্ড সরু এবং দুর্বল। বেলি গাছের পাতা উজ্জ্বল সবুজ। পাতার মাঝখানে ছোটো ছোটো থোকা থোকা অসংখ্য বেলি ফুল ফোটে। বসন্ত থেকে শুরু করে গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত পর্যাপ্ত বেলি ফুল পাওয়া যায়। বর্ষাকালেও বেলিফুল থাকে। বেলি ফুলের স্থায়িত্ব খুব কম। সন্ধ্যায় ফোটে এবং পরের দিন দুপুরে ঝরে পড়ে। মালা গাঁথার জন্য বেলি ফুলের সমাদর খুব বেশি। উৎসব-অনুষ্ঠানে মেয়েদের খোঁপায় বেলি ফুলের মালা শোভা পায়। বেলি বাংলাদেশের পরিচিত এবং জনপ্রিয় একটি ফুল ।

বকুল 

বকুল সুগন্ধযুক্ত ছোটো আকারের আকর্ষণীয় একটি ফুল। মালা গাঁথার কাজে বকুলের সমাদর খুব বেশি। বকুল ফুলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই যে, বকুল ফুল শুকিয়ে গেলেও তার গন্ধ নিঃশেষ হয় না। বকুল গাছ বেশ বড় আকৃতির হয়। এর কাও সরল এবং শক্ত। ফুলের রং ঘিয়ের মতো। পাতার রং সবুজ। বকুল ফুলের সুমিষ্ট গন্ধে মন ভরে যায়।

শিউলি

শিউলি ছোটো আকারের আকর্ষণীয় একটি ফুল। শিউলি ফুল-শেফালি নামেও পরিচিত। রং সাদা। শরৎকালে শিউলি ফুল ফোটে। এ ফুলের স্থায়িত্ব খুব কম। রাতে ফোটে এবং ভোরবেলায় ঝরে যায়। ভোরে শিউলিতলা ফুলে ফুলে ভরে থাকে। মালা গাথার কাজে এবং পূজা-অর্চনায় শিউলি ফুলের সমাদর রয়েছে। ইংরেজিতে শিউলিকে ‘নাইট জেসমিন’ বলা হয় ।

কদম 

কদম বর্ষার ফুল। হলুদ বর্ণের কদম ফুল দেখতে খুবই সুন্দর। এর গন্ধ মাদকতাপূর্ণ ও গাঢ়। বর্ষার আর্দ্র হাওয়ায় কদম ফুলের গন্ধ ভেসে বেড়ায়। কদম গাছ খুব বড় আকৃতির হয়। কদম পাতা বেশ বড় এবং উজ্জ্বল সবুজ রঙের হয়। টেনিস বলের আকৃতিযুক্ত কদমের পুষ্পাধার অজস্র ফুলে পরিপূর্ণ। এর প্রস্ফুটিত মঞ্জরি দেখতে সাদা-হলুদ বর্ণের। কদমের আদি নিবাস চীন দেশ। বাংলাদেশের প্রকৃতিতে কদম আমাদের দেশজ গাছ হিসেবেই সমাদৃত হয়ে আসছে।

শিমুল 

শিমুল বড় আকৃতির বৃক্ষ জাতীয় গাছ। এর আকৃতি বিশাল। বসন্তকালে পাতাবিহীন শাখা ভরে শিমুল ফুল ফোটে। শিমুল ফুল আকারে বড় এবং রং উজ্জ্বল লাল। শিমুল ফুলের উজ্জ্বল লাল রঙে এবং মধু-গন্ধে শিমুলের শাখায় পাখিরা ভিড় জমায়। শিমুলের পাকা ফল থেকে তুলা উৎপন্ন হয়। শিমুল-তুলা লেপ, তুশক, বালিশ, গদি, জাজিম প্রভৃতি তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। শিমুল বীজ থেকে তৈল উৎপন্ন হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশেও শিমুল গাছ জন্মে ।

পলাশ

পলাশ অগ্নিবর্ণের বা গাঢ় উজ্জ্বল কমলা রঙের ফুল। শীতের পাতা ঝরা শাখায় বসন্তের শুরুতে পলাশের শাখায় ফুল আসে। সমস্ত গাছ ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়। এ সময় পলাশ গাছ অগ্নিশিখার মতো উজ্জ্বল রূপ ধারণ করে। এ বৈশিষ্ট্যের জন্য পলাশকে অরণ্যের অগ্নিশিখা নামে অভিহিত করা হয়। পলাশের পাতার রং গাঢ় সবুজ। পলাশ ফুলের কুঁড়ি দেখতে অনেকটা বাঘের নখের মতো। ওষধি গাছ হিসেবে পলাশের সমাদর রয়েছে।

রজনিগন্ধা 

সুবাসযুক্ত ফুলসমূহের মধ্যে রজনিগন্ধা একটি অন্যতম ফুল। রাতের বেলায় গন্ধ ছড়ায় বলেই এর নাম হয়েছে রজনিগন্ধা। ফুলের রং ধবধবে সাদা। পাতার রং সবুজ। রজনিগন্ধার গাছ বহুবর্ষজীবী। উৎসব-অনুষ্ঠান, গৃহসজ্জা, বিয়ে প্রভৃতিতে রজনিগন্ধা ব্যবহৃত হয়। রজনিগন্ধা বারোমাসি ফুল হলেও বর্ষাকালই এ ফুল ফোটার এবার মৌসুম। রজনিগন্ধার আদি নিবাস মেক্সিকো । সূর্যমুখী : সূর্যমুখী বাংলাদেশের একটি অতি পরিচিত ফুল। সূর্যের দিকে এ ফুলের মুখ থাকে বলে একে সূর্যমুখী বলা হয়। সূর্যমুখী ফুলের বিন্যাস ও সৌন্দর্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর। ফুলের আকৃতি গোলাকার । পাতা চওড়া ও সবুজ। সূর্যমুখীর বীজ থেকে তেল উৎপন্ন হয়। শীত ও বর্ষাকালে সূর্যমুখী ফোটে। সূর্যমুখীর আদি নিবাস আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র ।

চাপা

চাঁপা বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় ফুল। চাঁপা গাছ্ উঁচু এবং চিরসবুজ। চাঁপা ফুলের রং সাদা ও হালকা-হলুদ বর্ণের। এ ফুলের গন্ধ সুমিষ্ট। পাপড়ি পুরু। বসন্ত থেকে শুরু করে বর্ষাকাল পর্যন্ত চাঁপা ফুল ফোটে। বিভিন্ন জাতের চাঁপা ফুল রয়েছে। স্বর্ণচাপা- ও হিমচাঁপা-চাঁপার ভিন্ন দুটি প্রজাতি। স্বর্ণচাপা বাংলাদেশের একটি অতি জনপ্রিয় ফুল। এর রং স্বর্ণের মতো হলুদ, গন্ধ খুবই সুমধুর। হিমচাঁপাও একটি’ সুমিষ্ট গন্ধযুক্ত ফুল। হিমচাঁপার পাতা গাঢ় সবুজ মোটা ও চওড়া। এ দু’ধরনের চাঁপা ছাড়া কনকচাঁপা, কাঁঠালিচাঁপা, দোলনচাঁপা, ভূঁইচাঁপা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

ফুলের প্রয়োজনীয়তা

ফুল কেবল সৌন্দর্য ও সুগন্ধের উৎস নয়— আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, প্রীতি-প্রেমে, উৎসব-অনুষ্ঠানে, রোগে-শোকে, পূজা-পার্বণে, জন্ম-মৃত্যুতে নানাভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে ফুল। ফুলের বিচিত্র উপযোগিতা লক্ষ করে কবি বলেছেন :

‘আমদেরি কুটীর কাননে ফুটে পুষ্প, কেহ দেয় দেবতা-চরণে কেহ রাখে প্রিয়জন তরে—তাহে তাঁর নাহি অসন্তোষ।’

ঋতুবৈচিত্র্য ও ফুলের সমাহার

বাংলাদেশ ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ। এদেশের প্রকৃতির কোলজুড়ে ঋতুতে ঋতুতে নানা জাতের ফুলের বিন্যাস ঘটে। বসন্ত ফুলের ঋতু। পলাশ, শিমুল, আম্র-মুকুল, অশোক, পারুল, মাধবী, হাসনাহেনা, রজনিগন্ধা প্রভৃতি ফুলের অজস্র সমাবেশে বসন্ত সাজে রানির সাজে। গ্রীষ্মের কাঠফাটা দগ্ধ প্রকৃতিকে আলো করে রাখে কৃষ্ণচূড়া। বর্ষার সজীব অঙ্গন সৌন্দর্যে ভরে দেয় কেয়া, কদম, যূথী, মালতি প্রভৃতি। শরতের আঁচল জুড়ে শোভা পায় শাপলা, শিউলি, কামিনী, পদ্ম, কাশফুল প্রভৃতি । হেমন্তে ফুলের তেমন সমাবেশ না থাকলেও শীতের বুক জুড়ে ফোটে গোলাপ, ডালিয়া, জিনিয়া, কসমস, সূর্যমুখী প্রভৃতি। বাংলাদেশে কোনো ঋতুই ফুল শূন্য নয়।

উপসংহার

বাংলাদেশের সবুজ প্রকৃতিকে অনাবিল সৌন্দর্যে মহিমান্বিত করেছে অজস্র ফুলের সমাবেশ। ফুল কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্যই নয়, মানুষের চিত্তের অনিঃশেষ মুগ্ধতাও বটে। আমাদের সযত্ন ও পুষ্প-মনস্কতায় বাংলাদেশের শ্যামল-সবুজ-আঁচল অজস্র ফুলের সঞ্চয়ে ভরে ওঠুক।

আশা করি আজকের পোস্টটি তোমাদের ভালো লেগেছে। তুমি যদি অন্য কোনো রচনা চাও তাহলে আমাদের কমেন্টের মাধ্যমে জানাও। ধন্যবাদ।

Related posts

 রচনাঃ শিক্ষাই নারী মুক্তির পথ

Swopnil

রচনাঃ বাংলাদেশের কুটির শিল্প

Swopnil

রচনাঃ একুশে ফেব্রুয়ারি

Swopnil

Leave a Comment